বছর দেড়েক আগের কথা। এক সন্ধ্যায় তাপসের ফোন (নাকি আমি-ই দিসিলাম!), এবং এরপর হুট করেই সিধান্ত বেরিয়ে পড়বার।

ওর তখন পায়ের নিচে সর্ষে, বিয়েও করেনি, আর এখনকার মত পুরদস্তুর চাকুরীজীবীও না। আমরা দুজনই মোটামুটি সমান লুথা। যাই হোক বেরিয়ে পড়লাম গন্তব্য না জেনেই। এটুকু সিধান্ত ছিল, রেলগাড়িতেই হবে যাত্রা।

প্রথমে মোটর বাইক, এরপর বাসে কমলাপুর। ওখানে গিয়েই হঠাৎ দুজনেই নস্টালজিক ছোটবেলার স্টিমার ভ্রমণ নিয়ে। বিকেলের ট্রেনে তাই যাত্রা দেওয়ানগঞ্জের উদ্দেশ্যে। পৌছালাম মধ্যরাতের কিছু পরে।

মাঝ বর্ষা তখন, ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতেই স্টেশনের পাশের এক রেস্টুরেন্ট থেকে রাতের খাবার সেরে আমরা তখন আশ্রয়ের উপায় খুঁজছি এক গাছের নিচে বসে। এর মাঝেই কিঞ্চিত মদ্যপ ছাত্রলীগ নেতার সাথে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষী ছাত্রদলের কর্মীর একটু বাদানুবাদ। শেষপর্যন্ত আশ্রয় জুটল স্টেশনেরই একটা অতিথিশালায়। আমরা তখন মহা খুশি। সবচেয়ে বেশি খুশি photogenic আরাম চেয়ারটা পেয়ে। প্রায় ভোর পর্যন্ত চলল ফটো সেশান। এবং প্রায় সিঙ্গেল একটা বিসানায় ঘুমবার আয়োজন। সবই ঠিক ছিল, আমার ধাক্কায় তাপসের নিচে পড়বার আগ পর্যন্ত। এরপরেই বোধয় তাপসের নবাব সুলভ অহমের পুনর্জাগরন  এবং আরাম চেয়ারেই রাত যাপন।

 

এই পুরোটা ‘পাগলামি’তে সব অনির্ধারিত বিষয়ের মাঝে একটা বিষয়ই ঠিক ছিল আমরা উন্মাদের মত ছবি তুলব, অনেক দিন পর। সকাল থেকেই তাই আমাদের আবার ফটো সেসান।

একটা মজার বিষয় হল, রাতেই জানতে পারলাম এত সাধের স্টিমার ভ্রমণ আর হচ্ছেনা। ছয় বছর ধরে স্টিমার সেবা বন্ধ। তাই সিধান্ত হল ছোট ট্রলারেই যমুনা পাড়ি দেব। এবং অদ্ভুত সে যাত্রায় কখনো তীব্র বৃষ্টি ভেজাল, কখনো ভীষণ তপ্ত রোদ পুড়ালো । তবে ছবি তোলা চলল পুরদস্তুর। কতদিন পর প্রাণ ভরে, ভীষণ উছ্বাসে ছবি তুলছিলাম।

ভরা বর্ষার এ সময়ে যমুনা পার হতে সময় লাগল আড়াই ঘণ্টার কিছু বেশি। ভিড়লাম বালাশি ঘাটে। কি ভীষণ বৃষ্টি তখন! দুপুরের খাবার সেরে কিঞ্চিত দ্বিধা নিয়ে ভাবলাম ঘরের ছেলে ঘরেই যাই। অনর্থ ঘটাবার মুল কারণ যাকে বলে, সে অর্থের পরিমাণ তখন খুবি সীমিত।

প্রথমে মোটর বাইক এরপর বাসে করে গাইবান্ধা থেকে রংপুর। আহা রংপুর! মা কে ভীষণ অবাক করে ঘরে ফিরলাম।

 

পরদিন তাপসকে শহর দেখাবার পালা। “দর্শনযোগ্য” আছেত ওই কারমাইকেল আর তিস্তা। আরেকটা নদী। আমার কত মুহূর্তের সাক্ষী!

আমার বাসা গোসাইবাড়ি কালি মন্দিরের খুব কাছে। খুব আশ্চর্য, বহু বসরের চেনা এ জায়গাটাই কি আশ্চর্য লাগে মধ্যরাতে। এবং আগে কখনো ছবি তোলা হয়নি।

বাবার পাথরের ব্যবসা। ট্রাক যায় সীমান্তের ওপারে। সেই ট্রাকের পিছে করেই এবার যাত্রা শুরু হল বুড়িমারির দিকে। বাবার ভ্রুকুটি আর ড্রাইভার মানিক ভাইয়ের অদ্ভুত দৃষ্টি উপেক্ষা করে তীব্র রোদে পুড়তে পুড়তে শুরু হল journey by truck.

খালি ট্রাকের ঝাঁকুনি সইতে সইতে পৌছালাম বুড়িমারি। তীব্র ঝালে অনেক ঘামালাম, হিচকি তুল্লাম , এরপর বেরলাম নদী দেখতে। আরেকটা নদী। ধরলাইত বল্ল সবাই। ছোট্ট নদীটাকেও খাচ্ছে লোকজন।


ফেরার সময় ২৪ টন পাথরে বোঝাই ট্রাকের মন্থর গতি আর অসংখ্য বিরতিতে বাসায় ফিরলাম ভোর রাতে। বাবা বসে ছিলেন গুদাম গেটে। আর মা দাঁড়িয়ে বাসার দরজায়। কুণ্ঠিত হলাম, আর সুখীও। কতদিন পর এইসব অনুযোগের মুখোমুখি।

অসম্ভব গায়ে ব্যথা নিয়ে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে দিন পার করে দেখি dhaka calling! তিন তিনটা নদী নিয়ে আমরা সে রাতেই ঢাকা ফিরলাম।